মে দিবসের মিছিল, শ্রমিকের দীর্ঘশ্বাস
প্রতি বছর ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে শ্রমিকের অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবি জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়। বাংলাদেশেও দিবসটি নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—শ্লোগান যত উচ্চকিত, শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা ততটা নিশ্চিত নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই মে দিবস শ্রমিকের অর্জনের চেয়ে বঞ্চনার বাস্তবতাই সামনে আনে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি শ্রমজীবী মানুষ। পোশাক শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, চা-বাগান, জাহাজভাঙা থেকে শুরু করে নানা খাতে শ্রমিকদের পরিশ্রমেই দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা সচল। অথচ বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে নেই স্বাস্থ্যসেবা, বীমা, দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ, পেনশন বা চাকরির নিশ্চয়তা।
কিছু খাতে উন্নয়ন হলেও অধিকাংশ শ্রমিক এখনো অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করছেন। নির্মাণশ্রমিক, পরিবহনশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক বা ছোট কারখানার কর্মীদের অনেকেই সুরক্ষা সরঞ্জাম, বিশুদ্ধ পানি বা স্বাস্থ্যসেবার অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় শ্রম দিচ্ছেন। অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা মানেই তাদের জন্য আয় বন্ধ, ঋণগ্রস্ততা ও অনিশ্চয়তা।
অন্যদিকে, ন্যূনতম মজুরি কিছুটা বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে অনেক বেশি। খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ সামাল দিতে গিয়ে অধিকাংশ শ্রমিকের আয় মাস শেষ হওয়ার আগেই ফুরিয়ে যায়। অতিরিক্ত পরিশ্রম করেও সঞ্চয় বা উন্নত জীবনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়।
চাকরির অনিশ্চয়তা, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, হঠাৎ ছাঁটাই, বেতন বিলম্ব ও দুর্বল শ্রমআইন বাস্তবায়ন শ্রমিকজীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ফলে উন্নয়নের বড় বড় সূচকের পেছনে শ্রমিকের অবদান থাকলেও সেই উন্নয়নের সুফল তাদের জীবনে খুব কমই পৌঁছায়।
তাই মে দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতার দিন নয়; এটি বাস্তব পরিবর্তনের আহ্বান। প্রয়োজন জীবনোপযোগী মজুরি, বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবীমা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা ও শ্রমিকের আইনি সুরক্ষা। কারণ শ্রমিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়নও সম্ভব নয়। মে দিবসের সত্যিকারের সার্থকতা তখনই, যখন শ্রমিকের জীবনে শ্লোগান নয়—নিরাপদ ভবিষ্যৎ বাস্তবে নিশ্চিত হবে।
লেখক: এম নুরুল আলম নুরু
হেড অফ (এইচ আর এ্যাডমিন এ্যান্ড কমপ্লায়েন্স)
প্যাডক্স জিন্স লিমিটেড, ঢাকা ইপিজেড।

